Ads Area

advertise

বৈদ্যুতিক শকে কীভাবে মানুষ মারা যায়?

0

লেখকঃ জাভেদ ইকবাল 

শরীরের ভেতর দিয়ে যখন বিদ্যুৎ যায়, সেটা শরীরের কিছু ক্ষতি করতে পারে। তাপ বাড়িয়ে আগুনের মত পুড়িয়ে দিতে পারে, ফুসফুস প্যারালাইজ করে দিয়ে অক্সিজেনের অভাবে মারতে পারে, হৃদপিন্ডের ছন্দ ভেঙ্গে দিয়ে হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে।
অনেকে ভাবে, যত বেশি ভোল্টেজ, মারা যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। আসলে মানুষ বা অন্য প্রাণী মারা যায় কারেন্টের পরিমানের জন্য, ভোল্টেজের জন্য না। ৪০-৫০ ভোল্টেই মানুষ মারা যেতে পারে, যদি যথেষ্ট কারেন্ট তার শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে ভোল্টেজ বাড়লে সাধারণত কারেন্টও বাড়ে, এবং ভোল্টেজ শরীরের রোধ কমিয়ে দিয়ে এই “যথেষ্ট কারেন্ট” পরিবহনে সাহায্য করতে পারে। তাই ভোল্টেজের একটা পরোক্ষ প্রভাব আছে।
প্রথম ছবিতে কত কারেন্টে শরীরে কী হবে, সেটার একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। ২য় ছবিতে একই জিনিস আরো বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। এখানে ভোল্টেজের কোন উল্লেখ নেই, কারন সেটার সরাসরি কোন প্রভাব নেই।
প্রথমে কিছু সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই সহজ রাখার জন্য কিছু বিস্তারিত বর্ণনা বাদ দিয়েছি। এই লেখার জন্য সেগুলি দরকারি না।

১) শক কী? শরীরের ভিতর দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহের জন্য আমাদের যে শারীরিক অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া হয়, সেটার নাম শক।

২) বিদ্যুৎ: কোন মাধ্যম (তার, ইত্যাদি) দিয়ে চার্জ-এর (আধানের) প্রবাহ। ধরে নেয়া যেতে পারে, এখানে চার্জ মানেই ইলেক্ট্রন এবং ইলেক্ট্রনের প্রবাহই বিদ্যুৎ।

৩) ভোল্টেজ বা বিভব: একটা মাধ্যমের দুই প্রান্তে চার্জের পরিমানের পার্থক্য। (এটা অতিসরলীকরন* এই লেখার জন্য)। । এটার একক ভোল্ট। বাংলাদেশে বাসার তারে ২২০-২৪০ ভোল্ট থাকে।

৪) কারেন্ট বা তড়িৎ প্রবাহ: চার্জের প্রবাহের হার। প্রতি সেকেন্ডে যত বেশি চার্জ যাবে, কারেন্ট তত বেশী। এটা মাপের একক অ্যাম্পিয়ার

৫) রেজিস্ট্যান্স বা রোধ: কোন মাধ্যমে চার্জ চলাচলে বাধার পরিমাণ। ধাতুতে এই বাধার পরিমাণ কম, বিশুদ্ধ পানিতে অনেক বেশি বাঁধা, কিন্তু একটু লবন গুলে দিলেই আবার সেটার রোধ অনেক কমে যায়। শুকনা কাঠ, রাবার, ইত্যাদিতেও রোধ অনেক বেশী। এটার একক ওহম। যে সব জিনিসের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ খুব ভাল চলে, সেগুলিকে ‘সুপরিবাহী’ বলা হয়। আর যেগুলি দিয়ে একদমই চলে না, সেগুলি অন্তরক বা কুপরিবাহী। আমরা উপরে বলেছি, ইলেক্ট্রনের প্রবাহ হচ্ছে বিদ্যুত। তাহলে এটা থেকে বোঝা যায়, সুপরিবাহীতে ইলেকট্রন সহজে চলে, অন্তরকে চলে না।

৬) কোন মাধ্যমের দুই প্রান্তে ভোল্টেজের তফাৎ না থাকলে সেটার ভেতর দিয়ে কারেন্ট যাবে না। ভোল্টেজ বাড়লে কারেন্ট বাড়বে, রোধ বাড়লে কারেন্ট কমবে। সুতরাং একটা মাধ্যমে কতটুকু কারেন্ট যাবে, সেটা নির্ভর করে ভোল্টেজ আর রোধের ওপর

৭) একটা তুলনা দেই: মনে করি একটা স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকে একটা চার্জ বা ইলেক্ট্রন। সোমবার সকাল ৬টার সময় সব ইলেক্ট্রন যার যার বাসায়, স্কুলে একজনও নেই। সুতরাং চার্জের পার্থক্য আছে দুই প্রান্তে (স্কুল ও বাসা)। স্কুলের সময় হলে সবাই স্কুলের দিকে যাবে (চার্জের প্রবাহ)। প্রতি মিনিটে কতজন গেইট পার হয়ে ঢুকছে, সেটা হচ্ছে কারেন্ট। যত বেশি ছাত্রছাত্রী (ভোল্টেজ), এই গেইট পার হওয়ার হার (কারেন্ট) তত বেশি। আর যদি তুমুল বৃষ্টি থাকে, রাস্তায় জ্যাম থাকে, সেগুলি হচ্ছে রোধ। রোধ যত বেশি, প্রতি মিনিটে কতজন গেইট পার হয়ে ঢুকছে, সেটার হার (কারেন্ট) কমতে থাকবে।
আর মানুষ যত জ্যামে পড়বে, স্কুলে যেতে যত দেরী হবে, মেজাজ/ভয় তত বাড়বে। তড়িৎ প্রবাহের সময়ও রোধ বেশি হলে তাপ বাড়তে থাকে। এর কারন হচ্ছে, চার্জের চলাচলের যে শক্তিটা আছে, সেটা বাধাপ্রাপ্ত হলে তাপে পরিণত হয়। ইলেকট্রিক হিটার বা লাইট বাল্বের কাছে হাত নিলেই এই তাপ টের পাওয়া যায়।

সব শেষে, যদি বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার একাধিক পথ থাকে, তাহলে যে রাস্তায় জ্যাম কম, সেই রাস্তা দিয়ে বেশি ছাত্রছাত্রীরা যাবে। ঠিক তেমনি, কারেন্ট চলার যদি একের বেশি পথ থাকে, তাহলে যে পথে রোধ কম, সেই পথ দিয়ে বেশি কারেন্ট যাবে।

অন্য যে কোন মাধ্যমের মতই, মানুষের শরীরও একটা মাধ্যম, এবং সেটার রোধ আছে। মানুষের শরীর শুকনা থাকলে মানুষের শরীরের গড় রেজিস্ট্যান্স বা রোধ ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ ওহম। ঘেমে গেলে (লবনাক্ত ও ভেজা) রোধ কমে যায়। চামড়ায় কাটাছেড়া থাকলে সেখানেও রোধ কমে যায় কারন লবনাক্ত রক্ত বিদ্যুৎ খুব ভাল পরিবহন করে।


আমরা উপরে দেখেছি, যত বেশি ভোল্টেজ, ততো বেশি চার্জ। এবং রোধের ভেতর দিয়ে চার্জ গেলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। যত বেশি রোধ, তত বেশি তাপ।
তাহলে মানুষের শরীরে কী হবে? যদি যথেষ্ট ভোল্টেজ থাকে, তাহলে তাপমাত্রা বাড়ার কারনে পুড়ে যাবে। চামড়া পুড়ে গিয়ে ক্ষত তৈরি হবে, সেখানে রোধ কমে যাবে, ফলে কারেন্টের প্রভাব বেড়ে যাবে।

শুনতে অবাক লাগে, কিন্তু আমাদের শরীর বিদ্যুৎ তৈরি করে**, এবং সেই বিদ্যুৎ আমাদের জন্য খুব জরুরী। আমরা যখন হাত পা নাড়াতে চাই, আমাদের মস্তিষ্ক হাত পা কে আমাদের নার্ভ দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে সেই কাজ করায়। মস্তিষ্কে চিন্তাভাবনাতেও*** বৈদ্যুতিক সংকেত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের হৃদপিন্ডও সংকোচিত ও প্রসারিত হয় বৈদ্যুতিক সংকেত পেয়ে। সেই সংকেত যদি সময়মত না পায়, তাহলে হৃদপিন্ড পাম্প করবে না, রক্ত চলাচল থেমে যাবে****। আবার উল্টাপাল্টা সংকেত পেলে হৃদপিন্ড উল্টাপাল্টা পাম্প করা শুরু করবে। ফলাফল—হার্ট অ্যাটাক।
আমরা যদি তাই কারেন্ট চলছে এমন কিছুতে হাত দেই, তাহলে শিরশির অনুভূতি হতে পারে। এটা হচ্ছে নার্ভে বাইরের অপরিচিত কারেন্ট ঢোকার ফলাফল। নার্ভ সেই বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায়, মস্তিষ্ক এই অনুভূতি তৈরি করে। যদি কারেন্ট বাড়তে থাকে, একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটা মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেতকে ছাপিয়ে যায় (বাসার পাশে প্রচন্ড শব্দে মাইক বাজার মত—পাশের লোকের কোন কথা আর বোঝা যায় না)। ফলে মস্তিষ্ক যদি নির্দেশ দেয়, “পা, দৌড় দাও”, সেই সংকেত পায়ের পেশী পর্যন্ত আর যেতে পারে না। ফলাফল: প্যারালাইসিস। ফলে আটকে থেকেও মারা যেতে পারে মানুষ। তাকে টেনে ছাড়াতে গেলে সেই উদ্ধারকারীর নিজে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশে এরকম পরিস্থিতিতে কাঠের টুকরা দিয়ে পিটিয়ে ছুটাতে দেখেছি।

কারেন্ট আরো বাড়লে এই প্যারালাইসিস ফুসফুস পর্যন্ত যেতে পারে, ফলে প্রথমে নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন হয়ে আসে, এবং এক সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তারপর হয় সবচাইতে মারাত্মক ঘটনা। কারেন্টের একটা বিশেষ পরিমাপে সেটা হৃদপিন্ডের বৈদ্যুতিক সংকেতের সাথে ঝামেলা করা শুরু করে। ফলে হৃদপিন্ড উল্টাপাল্টা বিট করা শুরু করে, এবং ফলে মৃত্যু হতে পারে।  তার মানে ঐ কারেন্টে হাত লাগা মানেই কী হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে যাবে? না—সব কারেন্ট হৃদপিন্ড পর্যন্ত পৌছাতে পারে না। তবে যদি কেউ এক হাত দিয়ে তড়িৎপ্রবাহী তার ছোয় আর অন্য হাত দিয়ে মাটি ছোয়, তাহলে এক হাত থেকে আরেক হাতে কারেন্টের প্রবাহ হবে এবং সেটা খুব সম্ভবত হৃদপিন্ডের ভেতর দিয়েই যাবে। হাত দিয়ে তার ধরলে এবং পা যদি মাটিতে থাকে, তাহলেও হৃদপিন্ড দিয়ে কারেন্ট যেতে পারে। (৩য় ছবি)। এছাড়াও হৃদপিন্ডের পেশিরও ক্ষতি হতে পারে। কেউ যদি এক হাত বা এক পা দিয়ে তার ছোয় কিন্তু শরীরের বাকি অংশ বাতাস বাদে অন্য কিছুকে স্পর্শ না করে থাকে, তাহলে হৃদপিন্ড দিয়ে কারেন্ট যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

কিন্তু কারেন্ট যদি সেই পরিমাপের (০.২ অ্যাম্পিয়ারের) উপরে থাকে, তাহলে হৃদপিন্ডের পেশি আড়ষ্ট হয়ে যায়, ফলে উল্টাপাল্টা বিট করতে পারে না। সাথে করে তাপমাত্রা এতো বেড়ে যায় যে শরীরে আগুন লাগার মত পুড়ে যায়, এবং নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে আসতে পারে। তাই ১১,০০০ ভোল্টের লাইনে ছোয়া লেগে নিমেষে হাত ছাই হয়ে গিয়েছে কিন্তু বেঁচে ফিরেছে এমন ঘটনা আছে, অথচ মাত্র ২২০ ভোল্টে মারা গিয়েছে, এমন ঘটনা হয়।
প্রথম ছবিতে দেখানো হয়েছে, ০.১-০.২ অ্যাম্পিয়ারে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এছাড়াও কত কারেন্টে শরীরে কী হবে, সেটার একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়  ছবিতে একই জিনিস আরো বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। সেখানে আনুভূমিক অক্ষে কারেন্টের পরিমাপ, আর উল্লম্ব অক্ষে সময় দেখানো হয়েছে। সাথে করে ছবিতে রং দিয়ে বিপদের মাত্রা বোঝানো হয়েছে। প্রথম আর দ্বিতীয় ছবিতে আপাতদৃষ্টিতে একটু তফাৎ আছে বলে মনে হয়। সেটার কারন প্রথম ছবিতে সময়কে হিসাবে না নিয়ে অতি সরলীকরণ করা হয়েছে।
এই ছবির নীল, AC-1 অংশে বিদ্যুতের পরিমাণ এক অ্যাম্পিয়ারের ১০ লক্ষভাগের মধ্যে ৫০০ ভাগ বা আরো কম (৫০০ μ অ্যাম্পিয়ার) । এখানে বিদ্যুতের প্রবাহ মানুষ টের পাবে না, যত সময় ধরেই চলুক না কেন।
সবুজ, AC-2 অংশে টের পাবে, কিন্তু পেশীতে কোন প্রতিক্রিয়া হবে না প্রথমে। তবে যদি এক অ্যাম্পিয়ারের ১০০০ ভাগের ৫ ভাগ হয় (৫ মিলি অ্যাম্পিয়ার), তাহলে ৫ সেকেন্ডের পরে প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সেটা যদি ১০ মিলি অ্যাম্পিয়ার হয়, প্রতিক্রিয়া হবে ২ সেকেন্ডের মধ্যে। ১০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার বা ০.১ অ্যাম্পিয়ার হলে প্রতিক্রিয়া হবে ০.১ সেকেন্ডে।

এই একই ০.১ অ্যাম্পিয়ার, প্রথম ছবির লাল অংশের শুরু, ২য় ছবিতে সময়ের অক্ষে দেখানো হয়েছে ৫০০ মিলি সেকেন্ড বা অর্ধেক সেকেন্ডে লাল অংশে চলে গিয়েছে।
এই লাল অংশ হচ্ছে মারাত্মক ঝুকির ইঙ্গিত।
AC-4.1 এ পাঁচ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃদপিন্ড উল্টা পালটা বিট করবে। ২য় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এই AC-4.1 এলাকা সময়ের সাথে (যত উপরে উঠছে) তত বামে সরছে (কম কারেন্টেও এটা হবে)। AC-4.2 এলাকাতে ৫০% ক্ষেত্রে হৃদপিন্ডের সমস্যা হবে। আর AC-4.3 তে ৫০% এর বেশী ক্ষেত্রে এই সমস্যা হবে।

দুইটা বিশেষ ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করি
১) একটা বজ্রপাতে ৪০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ ভোল্ট পর্যন্ত থাকতে পারে। আর কারেন্ট থাকতে পারে ৫০০০ থেকে ২ লাখ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত (আকাশে যে বিদুৎ চমকায়, সেখানে আরো অনেক বেশী থাকে)। তাহলে যেখানে বাসার ২২০ ভোল্ট, ১৫ অ্যাম্পিয়ারে মানুষ মারা যায়, ১১,০০০ ভোল্টের তারে লেগে হাত ছাই হয়ে যেতে পারে, সেখানে বজ্রপাতের পরেও মানুষ বাঁচে কীভাবে? এটার একটা আভাস ২য় ছবিতে আংশিক দেয়া আছে। উত্তরটা হচ্ছে সময়—এক সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময় এই ভোল্টেজ ও কারেন্ট থাকে। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেশি বাড়ার বা প্যারালাইসিস হওয়ার সময় পায় না, তবে সময় যত কমই হোক না কেন এত ভোল্টেজের কারনে তাপমাত্রা একটু বাড়ে, ফলে মানুষ পুড়ে যায়, অনেকে মারাও যায়।

২) বিসিবিতে মাঝে মাঝে এই প্রশ্ন আসে—পাখি কীভাবে আহত/নিহত না হয়ে বিদ্যুতের তারে বসে? পাখির বেঁচে থাকের কারন হচ্ছে, পাখির দুই পা একই তারে স্পর্শ করে থাকে। তার সুপরিবাহী, পাখির শরীর সুপরিবাহী না। কারেন্টের নিয়ম, যেই পথে বাঁধা বা রোধ কম, সেই পথ দিয়ে যাবে। ফলে সুপরিবাহী তার দিয়েই সব কারেন্ট যায়, পাখির শরীর দিয়ে যায় না, ফলে পাখির কিছু হয় না।
পাখিটার দুই পা যদি দুই ভোল্টেজের দুই তারে থাকতো? তাহলে তার শরীর দিয়ে এক তার থেকে আরেক তারে বিদ্যুৎ যেত, এবং পাখিটা মারা যেত। মাঝে মাঝে শরীরের দুই অংশ দুই তারে লেগে এই জন্য কাক বা অন্য পাখি মারা যায়।

তার মানে মানুষ কী এই কাজ করলে বেঁচে থাকবে? হ্যা। কেউ যদি লাফ দিয়ে দুই হাত দিয়ে একটা ইলেট্রিকের তার ধরে ঝুলে পড়ে, এবং তার শরীর আর কিছু স্পর্শ না করে, এবং বাতাসে জলীয় বাষ্প না থাকে, তাহলে সে পাখির মতই শক খাবে না।  এই পরীক্ষা যেন আবার কেউ না করে, কারন কিছুতে ছোঁয়া লেগে গেলেই শেষ। তবে প্রতিদিন বহু বাসায় এর কাছাকাছি একটা ঘটনা ঘটে—স্পঞ্জের (অন্তরক) স্যান্ডেল পরে ইলেক্ট্রিশিয়ানরা বিদ্যুতের তারে হাত দেয়। এমনকি ইলেক্ট্রিশিয়ান না, এমন মানুষও হাত দিয়ে হালকা শক খায়, অথবা কোন শকই খায় না। কারন পায়ে কুপরিবাহী স্যান্ডাল থাকায় তার শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ চলার কোন পথ পায় না, ফলে বিদ্যুৎ পরিবাহী তার দিয়েই চলতে থাকে। আবারও বলছি, বাসায় এই পরীক্ষা কেউ করতে যেও না। সব স্যান্ডাল যে কুপরিবাহী, সেটার কোন নিশ্চয়তা নেই; সেটা ছাড়াও অন্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
শেষ কথা—বিদ্যুত মারাত্মক জিনিস। না জেনে, যথেষ্ট সাবধানতা না নিয়ে এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গেলে সাংঘাতিক আহত হওয়ার বা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

-------------
*ভোল্টেজের আসল সংজ্ঞা হচ্ছে একটা চার্জকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কতটুকু কাজ করা লাগে, তার পরিমাপ, তবে এটা এই লেখা বোঝার জন্য জানার দরকার নেই।

**আমাদের শরীরে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থ আছে, যেগুলি সহজ করে বললে ব্যাটারির ভেতরের কেমিক্যালের মত কাজ করে, এবং শরীরের কোষগুলি ব্যাটারির মতই বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। এটা থেকে শরীরে এই সব রাসায়নিকের সঠিক পরিমানের গুরুত্বও বোঝা যায়।

***মস্তিষ্ক যেহেতু বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায়, এবং মস্তিষ্ক নিজেও কাজ করে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে, তাই বিদ্যুৎ মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। বড় শক খেলে, যেমন বজ্রপাতে, মানুষের বিষণ্ণতা রোগ হতে পারে। এক সময়ে মানসিক রোগীকে শক দিয়ে চিকিৎসা করা হতো। এটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এখন আবার শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানেন না এটা ঠিক কীভাবে কাজ করে, তবে কোন কোন ক্ষেত্রে খুব ভাল কাজ করে সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

****অনেকের বিভিন্ন কারনে হৃদপিন্ডের সমস্যা থাকে। তাদের শরীরে অপারেশন করে পেইস-মেকার বলে একটা যন্ত্র বসিয়ে দেয়া হয়, যেটার কাজ হচ্ছে হৃদপিন্ডকে নিয়মিত শক দিয়ে চালিয়ে রাখা। ইমপ্ল্যান্টেবল ডিফিব্রিলেটর বলে আরেক ধরণের যন্ত্র আছে, যেটা হৃদপিন্ডের কাজ পর্যবেক্ষন করতে থাকে এবং দরকার হলে বিশাল শক দিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদপিন্ডকে আবার চালিয়ে দেয়। সিনেমায় মাঝে মাঝে এই ধরণের জিনিস দেখা যায় তবে সেটা বাইরে থেকে শক দিয়ে হৃদপিন্ডকে আবার চালু করে।

২য় ছবি উইকিপেডিয়া থেকে 
৩য় ছবি https://academic.oup.com/eurheartj/article/39/16/1459/3746021 থেকে 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Top Post Ad

Below Post Ad

advertise